রাখাইনে সমর্থন বাড়ছে ‘আরাকান আর্মি’র, নেপথ্যে সেনাবাহিনী

মাহাদী হাসান : জাতিগত সংঘাত ও দারিদ্র্য-জর্জরিত রাখাইনে কেবল রোহিঙ্গারাই একমাত্র নিপীড়িত জাতিগোষ্ঠী নয়। রাখাইন বৌদ্ধরা (আরাকান জাতিভূক্ত) সহ সেখানকার বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী সেনাপ্রাধান্যশীল কেন্দ্রীয় সরকারের নিপীড়নের শিকার হয়। কেবল রোহিঙ্গা ছাড়া বাদবাকি সব জনগোষ্ঠীর স্বীকৃতির প্রশ্নকে সামনে রেখেই নিজেদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে আরাকান আর্মি। আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে এই সরব ভূমিকা বিশেষত রাখাইন বৌদ্ধদের মধ্যে তাদের গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তি হয়েছে। বামার জাতিগোষ্ঠীর প্রাধান্যশীল কেন্দ্রীয় সরকারের বঞ্চনা আর অব্যাহত সেনা-নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তারা স্থান করে নিচ্ছে বঞ্চিত মানুষের হৃদয়ে। বিশ্লেষকরা তাই মনে করছেন, সেনাদমনের মধ্য দিয়ে আরাকান আর্মিকে রাখাইন থেকে নিশ্চিহ্ণ করার ঘোষণা দিলেও সহসা সেনাবাহিনী তা করতে সক্ষম হবে না। বরং তাদের ওপর সেনাদমন অব্যাহত থাকলে জনগণের মধ্যে তাদের সমর্থন আরও বেড়ে যেতে পারে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের এক প্রতিবেদনেও একই ধরনের আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

আরাকান আর্মি

তেলসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর রাখাইন। বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পের সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ -অঞ্চল হওয়ায় চীনেরও নজর রয়েছে এই প্রদেশে। তারপরও রাখাইন দেশটির অন্যতম দরিদ্র প্রদেশ। বিশ্ব ব্যাংকের জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ১৭ শতাংশ বাড়িতে বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা রয়েছে, মিয়ানমারের অন্য যে কোনও প্রদেশের সাপেক্ষে যা সামান্য। জরিপের তথ্য অনুযায়ী প্রায় ৩ লাখ বাড়িতে টয়লেট নেই। এছাড়া মিয়ানমার সরকারের অর্থনৈতিক ও ঐতিহাসিক অবিচারের শিকার হওয়া রাখাইন আর এর ভিন্ন ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীকে তারা পেয়েছে এক উর্বর ভূমি হিসেবে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর করায়ত্ত রাখাইনে প্রাকৃতিক সম্পদ লুণ্ঠন ও অর্থনৈতিক বঞ্চনা তাদের রাজনৈতিক পুঁজি। বঞ্চনার কথা তুলে আনায় সংগঠনটির সঙ্গে শরিকানা বোধ করে সাধারণ আরাকানিরা। ড. মিন জাও ও মনে করেন, ‘এই সমর্থনের কারণে আরাকান আর্মিকে রুখতে সেনাবাহিনীকে বেগ পেতে হবে।

রাখাইনের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে এরইমধ্যে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে আরাকান আর্মি। এছাড়া বুথিয়াডং, প্রায় ১০ বছর আগে ২৬ জন আরাকান পুরুষকে নিয়ে গঠিত হয়েছিলো আরাকান আর্মি। এরপর থেকে আকারে ও জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে তাদের। ধারণা করা হয়, এই মুহূর্তে তাদের ৭ হাজার সেনা রয়েছে। তবে তাদের আসল অস্ত্র আসলে সামরিক শক্তি নয়, বরং আরাকানের জনসাধারণের অকুন্ঠ সমর্থন। রাথেডং, পোনাহগুন ও কুইকতাওয়েও নিয়ন্তণ তাদের। এছাড়া শিন প্রদেশের পালেতায়াতে শক্ত অবস্থান রয়েছে গোষ্ঠীটির। ফলে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সামনে শক্ত চ্যালেঞ্জ নিয়েই দাঁড়িয়ে আছে গোষ্ঠীটি। মিয়ানমার ইনস্টিটিউট ফর পিস অ্যান্ড সিকিউরিটির নির্বাহী পরিচালক ড. মিন জাও ও তাই মনে করছেন, ‘এই জনপ্রিয়তার কারণে সেনাবাহিনীর অনেক কৌশল অবলম্বন করতে হবে।’

৪ জানুয়ারি মিয়ানমারের স্বাধীনতা দিবসে মিয়ানমারের বর্ডার পুলিশের ফাঁড়িতে হামলা চালায় আরাকান আর্মির সদস্যরা। হামলায় ১৩ জন পুলিশ সদস্য নিহত ও অপর ৯জন আহত হয়। ৫ জানুয়ারি সেনাবাহিনীর মিডিয়া উইং মিয়াওয়াডি ডেইলির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পূর্বে সংঘটিত যেকোনও হামলার চেয়ে এই হামলার ব্যাপকতা ও হামলাকারীর সংখ্যা অনেক বেশি ছিলো। বিগত বছরগুলোতে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কয়েকবার বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ হয়েছে আরাকান আর্মির। গোষ্ঠীটির দাবি, বিগত কয়েকমাসে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর অন্তত ২৪টি হামলা চালিয়েছে তারা। তারা দাবি করে, রাখাইনে বেসামরিকদের লক্ষ্য করে চালানো সামরিক আগ্রাসনের জবাব দিচ্ছেন তারা। ইরাবতিকে দেওয়া সাক্ষাতাকারে আরাকান আর্মির প্রধান ম্রাত নাইং বলেন, ‘রাখাইনের অবশ্যই নিজেদের বাহিনী থাকা উচিত। এমন সশস্ত্র বাহিনী থাকলেই রাখাইনের জাতিগোষ্ঠী টিকে থাকবে।’

মিয়ানমারের মানবিক পরিস্থিতি, উন্নয়ন ও নিরাপত্তা বিষয়ক স্বাধীন গবেষক কিম জলিফি বলেন, স্বাধীনতা দিবসে হামলায় এটাই স্পষ্ট হয় যে আরাকান আর্মি এখন রাখাইনে অনেক সক্রিয়। আর এতে করে আরাকানের সাধারণ মানুষরা খুশি। আরাকান আর্মি চীন ও ইউনাইটেড ওয়া স্টেট পার্টির সমর্থনপুষ্ট জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর কাছ থেকেও সমর্থন পেয়েছে। সশস্ত্র অভিযানে সমর্থন রয়েছে আরাকানের রাজনীতিবিদ ও কর্মীদের কাছ থেকেও।

ইতিহাস আর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সংরক্ষণসহ রাখাইনে সার্বভৌম কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের প্রশ্নকে সামনে রেখে প্রচারণা চালায় আরাকান আর্মি। রাখাইনে প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্যের তথ্য বারংবার সামনে আনার মধ্য দিয়ে সেখানকার দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্রীয় সরকারের বঞ্চনার বিরুদ্ধে সচেতন করে তুলছে তারা। জাফরি তাই মনে করছেন, সামরিক অভিযানের কারণে আরাকান আর্মি আরও প্রভাবশালী হয়ে উঠবে। এতে করে দীর্ঘসময় ধরে একটি গোষ্ঠী বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়তে পারে এবং আরাকান আর্মি প্রভাবে একটি বেসামরিক সমর্থকগোষ্ঠী তৈরি হতে পারে। সেটা রাখাইনের প্রত্যন্ত অঞ্চল কিংবা নির্বাসনে গিয়েও হতে পারে। তিনি মনে করছেন, সহিংস পরিস্থিতিতে আরাকান আর্মির সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ জনগণ ও বাস্তুচ্যুতরা সরকার ও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সরব হয়ে উঠতে পারে।

ইরাবতির প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ১৯৬২ সালের পর থেকে আরাকানদের প্রতিনিধিত্ব করার মতো খুব বেশি সংগঠন ছিলো না। ছোট শক্তি হওয়ায় আরাকান লিবারেশন পার্টির সশস্ত্র উইং আরাকান লিবারেশন আর্মি কখনোও জনপ্রিয়তা পায়নি। তবে সেক্ষেত্রে ব্যতিক্রম আরাকান আর্মি। তারা আরাকানদের পূর্ণ সমর্থন পেয়েছেন। আরাকান রাজ্যের সময়কালীন আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে জনসাধারণের সমর্থন রয়েছে গোষ্ঠীটির। ইরাবতির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সশস্ত্র ওই গোষ্ঠী আরাকানি জনসাধারণের প্রশ্নাতীত সমর্থন পাচ্ছে। এমনকি বাবা-মা তাদের সন্তানকে এই বাহিনীতে যোগদানে উদ্বুদ্ধও করছে। সেখানকার বেশিরভাগ রাজনীতিবিদরাও সমর্থন দিচ্ছে তাদের।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ তাদের সদ্য প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলছে, আরাকান আর্মির হামলার বিপরীতে সরকারের পক্ষ থেকে ওই সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সন্ত্রাসী আখ্যা দেওয়া এবং তাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত দমন অভিযান ‘তাদের প্রতি স্থানীয়দের অপ্রকাশিত সমর্থনকে জাগিয়ে তোলা এবং তাকে আরও প্রকাশ্যে আনার মধ্য দিয়ে রাখাইনের সশস্ত্র সংঘাতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তারা আশঙ্কা জানিয়েছে, নতুন মাত্রার ওই সংঘাত আরও জোরালো হওয়ার মধ্য দিয়ে রাখাইনকে আরও দীর্ঘমেয়াদি সশস্ত্র সংঘাতের পথে ঠেলে দিতে পারে।

শেয়ার করুন এখান থেকে